দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা ও কূটনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেই প্রতিবেশী আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান। শুক্রবার ভোরে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ দেশটির একাধিক শহরে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে তারা। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তালেবান প্রশাসন ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে এবং এখন থেকে এ লড়াই যুদ্ধে রূপ নিল। তারা এ অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন গজব লিল হক’।
কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরার জানিয়েছে, শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ১টা ৫০ মিনিটে হামলা শুরু করে পাকিস্তান। জবাবে আফগান বাহিনীও বিমান বিধ্বংসী গোলাবর্ষণ করে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, কাবুল ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ কান্দাহার ও পাক্তিয়ায় তালেবানের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়েছে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের দাবি, কয়েক ঘণ্টার এ অভিযানে তালেবানের একটি ব্রিগেড সদর দপ্তর, গোলাবারুদের ডিপো এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চেকপোস্ট ধ্বংস করা হয়েছে।
পাকিস্তান সরকারের মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করেছেন, এ হামলায় অন্তত ২৫০ আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ২০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছে। তবে তালেবান সরকার এ পরিসংখ্যান প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তাদের মাত্র ৮ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছে। উল্টো তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেছেন, ডুরান্ড লাইন বরাবর পাল্টা হামলায় তারা ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে এবং দুটি সামরিক ঘাঁটি দখল করে নিয়েছে।
কেন সংঘর্ষ?
আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তকে ডুরান্ড লাইন বলা হয়, যার দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার।আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এ সীমান্ত স্বীকৃতি দেয় না, কারণ তাদের মতে এটি ঔপনিবেশিক যুগের আরোপিত বিভাজন।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সেনা প্রত্যাহারের পর থেকে এ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে প্রায় ৭৫টি সংঘর্ষ হয়েছে বলে আল জাজিরাকে জানিয়েছেন স্থানীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক সামি ওমারি।
পাকিস্তানের অভিযোগ, পাকিস্তান তালেবানকে (টিটিপি) আশ্রয় দিচ্ছে আফগানিস্তান। ২০০৭ সালে গঠিত টিটিপি আফগান তালেবান থেকে আলাদা হলেও আদর্শগত ও সামাজিকভাবে ঘনিষ্ঠ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে টিটিপি ও বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির হামলা বেড়েছে।
সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক আবদুল বাসিত বলেন, আফগান তালেবানের সামরিক সক্ষমতা পাকিস্তানের তুলনায় দুর্বল। তাদের আত্মঘাতী হামলাকারী ও কামিকাজে ড্রোন রয়েছে—সম্ভবত সেগুলোই বেশি ব্যবহার করবে।
এদিকে, আফগানদের বিমানবাহিনী নেই। ফলে আকাশপথে পাকিস্তানেরই সুবিধা বেশি। তবে পাকিস্তানি সেনারা স্থলসীমান্ত অতিক্রম করবে এমন সম্ভাবনা কম। যদিও ভারী আর্টিলারি দিয়ে গোলাগুলি অব্যাহত থাকতে পারে।
পাকিস্তানের ‘সরাসরি যুদ্ধ’ ঘোষণার অর্থ কী?
কাবুলসহ তিনটি প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘সরাসরি যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তিনি বলেন, আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষের প্রতি ইসলামাবাদের ‘ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে’। দুই দেশ এখন ‘উন্মুক্ত যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েছে। এখন প্রশ্ন উন্মুক্ত যুদ্ধের অর্থ কী?
এ প্রসঙ্গে আফগানিস্তান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আমিন সইকাল বিবিসির নিউজ-ডে প্রোগ্রামে বলেছেন, এটি একটি ‘অত্যন্ত গুরুতর অগ্রগতি’। ইসলামাবাদ ইঙ্গিত দিচ্ছে, পাকিস্তানে সাম্প্রতিক হামলার নেপথ্যে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদদ দেয়ার অভিযোগে তারা আফগান তালেবানদের ‘শাস্তি’ দিতে চায়।
তার মতে, আফগানরা নিজেরাই অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে এ উত্তেজনা বৃদ্ধি আফগানিস্তানের জনগণের জন্য বিপর্যয়কর হবে।
আফগানিস্তানের কোন কোন এলাকা লক্ষ্যবস্তু?
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানান, কাবুল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাকতিয়া প্রদেশ ও দক্ষিণের কান্দাহারে ‘আফগান তালেবানের প্রতিরক্ষা লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলা চালানো হয়েছে। তালেবান মুখপাত্র মুজাহিদও এ তিন প্রদেশে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে দুই পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের খবরে বলা হয়, আফগানিস্তানের দুটি ব্রিগেড ঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পাকিস্তান টিভি দাবি করছে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একাধিক তালেবান স্থাপনা ‘ধ্বংস’ করা হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল কান্দাহারের একটি ব্রিগেড সদরদপ্তর ও গোলাবারুদ ডিপো, বাজার ও আংগুর আড্ডাসহ সীমান্তবর্তী কয়েকটি সেক্টর।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় আরো জানায়, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের চিত্রাল, খাইবার, মোহমান্দ, কুররম ও বাজাউর জেলাতেও আফগান তালেবান বাহিনীকে লক্ষ্য করে অভিযান চলছে।
শুক্রবার সকালে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ তোরখাম সীমান্ত ক্রসিংয়ের কাছে গোলাগুলি ও ভারী গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া যায়। আল জাজিরা ও এএফপি জানায়, আফগান সেনারা সীমান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। যদিও অক্টোবরের সংঘর্ষের পর থেকে স্থলসীমান্ত মূলত বন্ধ, তবু পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা আফগানদের জন্য তোরখাম খোলা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এ ঘটনাকে পাকিস্তানের ‘অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা’ বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। তিনি বলেন, রমজান মাসে নারী ও শিশুসহ বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটিয়ে আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলা আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।
উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস। আর রমজানের প্রেক্ষাপটে সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচী।
এদিকে, অবিলম্বে সীমান্তপারের হামলা বন্ধ করে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া। প্রয়োজনে মধ্যস্থতা করতে চায় মস্কো।
সামরিক সক্ষমতায় কে এগিয়ে
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বর্তমান সামরিক শক্তির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ ও সামরিক সক্ষমতায় আফগানিস্তানের তুলনায় অনেক শক্তিশালী। তবে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় গেরিলা যুদ্ধে অত্যন্ত দক্ষ তালেবান। ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার আগে তারা কয়েক দশক ধরে সশস্ত্র লড়াই চালিয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীতে প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার সদস্য রয়েছে। অন্যদিকে তালেবান সরকারের অধীনে আফগানিস্তানে যোদ্ধা রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার। সামরিক অস্ত্রের সংখ্যায়ও অনেক এগিয়ে পাকিস্তান। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার সাঁজোয়া যান এবং ৪ হাজার ৬০০টির বেশি আর্টিলারি বা ভারী কামান রয়েছে। অন্যদিকে, তালেবানের কিছু সাঁজোয়া যান থাকলেও সেগুলোর অধিকাংশ পুরোনো। সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত নয়।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কাছে অন্তত ৪৬৫টি যুদ্ধবিমান ও ২৬০টি হেলিকপ্টার রয়েছে। এদিকে আফগানিস্তানের কার্যকর কোনো বিমান বাহিনী নেই। তাদের কাছে কিছু পুরোনো বিমান ও হেলিকপ্টার থাকলেও সেগুলো কতটা সক্রিয়, তা স্পষ্ট নয়। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেলে যাওয়া সামরিক সরঞ্জাম তালেবান বাহিনী হাতে পেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর সক্ষমতা কমে গেছে। বর্তমানে ওইসব সরঞ্জামের প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট নয়।
আর আইআইএসএসের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের কাছে আনুমানিক ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই।
সামনে কী?
বিশ্লেষকদের মতে, আফগান তালেবান যদি টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে পরিস্থিতির আরো বড় ধরনের অবনতি হতে পারে। দুই দেশের পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র যুদ্ধ আফগানিস্তানের জন্য অনুকূল হবে না—কারণ সামরিক শক্তিতে পাকিস্তান এগিয়ে। তবে সীমান্তজুড়ে গোলাগুলি ও পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকলে উত্তেজনা দ্রুত আরো ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে।
Editor & Publisher
Dulal Ahmed Chowdhury
www.newsdiplomats.com
The News Diplomats
Cell: +1 (437) 365-4003 & +1 (647) 709-3389
Email: newsdiplomats@gmail.com
Toronto, Canada.
©২০২৩ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || The News Diplomats